রাজযোটক -- {দ্বিতীয় পর্ব }
![]() |
| রাজযোটক - Green Vivacity |
ডাক্তার অমিতবাবুর ঔষধ ও মলম নার্সকে বুঝিয়ে দিয়ে বললেন সিস্টার জানেন পুরুষ বা মহিলা অবৈধ প্রেমে পড়লে পশু হয়ে যায়। ডাক্তার চলে গেলে দেবলীনা যীশু ও মেয়েকে নিয়ে বলল অমিতদা জ্বালা যন্ত্রনা একটু কমেছে ? অমিতবাবু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। হ্যাঁ, দেবলীণা তুমি আমার জন্য অনেক করল। কি আর করলাম। সবই আমাদের দুর্ভাগ্য। একরাশ সহানুভুতি ও মুগ্ধতা নিয়ে অমিত বসুর মুখের দিকে তাকিয়ে দেবলীনা বলল আপনার মতো স্বামী পেলে নিজেকে সৌভাগ্যবতী ভাবতাম। রাণুবৌদি রত্ন পেয়ে ধরে রাখতে পারল না। দেহ মনে এত জ্বালার মাঝেও অমিতবাবু দেবলীনার সুমখশ্রীর টানা দুচোখে নিবীড় শান্তির আশ্রয় খুঁজে পেলেন। শুনেছেন কলেজে পড়ার সময় এই মেয়েটিকে ওর বাবা মা মদ্যপ ধনী ব্যবসায়ীর সাথে বিয়ে দিয়েছে। তিনি বললেন দেবলীনা তোমার মতো লক্ষ্মীময়ী স্ত্রী পেলে আমি সুখী হতাম।
ছেলেটা মানুষ হত। কিন্তু রাণুকে ডিভোর্স করতে না পারলে সম্ভব নয়। ঘড়িতে সারে এগারোটা বাজে। অলক বারোটার সময় দোকান থেকে ফিরে দেবলীনাকে ঘরে না দেখলে ঝগড়া করবে। যদি জানে আহত অমিতদার জন্য হাসপাতালে এসেছে তাহলে মারবে। ও বলল অমিতদা এখন আসি, বিকালে এসে দেখে যাব। অমিত বসু হাতের ইসারায় ডেকে বলল দেবলীনা তুমি আমার ছেলের দিকে লক্ষ্য রেখ।আমি যেদিন হাসপাতাল থেকে ছুটি পাবো যীশুকে নিয়ে আসবে। আমি ওকে নিয়ে কলকাতায় যাব। ছেলে আমার কাছে থাকতে চায়।
রাণুকে ফোনে ডিভোর্সের কথা জানাব। ছয়দিন পর অমিতবাবু রিলিজ পেলেন।সকাল দশটার আগে দেবলীনা যীশুকে নতুন জামা প্যান্ট পরিয়ে নিয়ে এসেছে। একদিনও রাণু দেখতে আসেনি। সে প্রতিবেশীদের মুখে শুনেছে স্বামী তার নামে পুলিশে অভিযোগ করেনি। রাণু গর্ব করে অলককে বলেছে আমার বিরুদ্ধে কিছু করার সাহস ওর নেই। ওকে ঘরেই ফিরে আসতে হবে। রাণু ছেলেকে প্রতিবেশী টুয়েলভে পড়া আমিতবাবুর এক ছাত্রের সাথে বাবাকে দেখতে পাঠিয়েছে। দেবলীনা লুকিয়ে পিছু নিয়ে যীশুর সাথে এসেছে। ভিজিটিং আওয়ারে ছাত্ররা ও সহশিক্ষকরা অমিতবাবুকে দেখে চলে গেছে।
নিরালায় একা পেয়ে ওড়নায় মাথা ঢেকে টুলে বসে দেবলীনা সজল চোখে ভেঙে পড়ল। অমিতদা তুমি না থাকায় আমার স্বামী ও রাণু ব্যাভিচারী হয়ে উঠেছে। ওরা রাতে একসঙ্গে তোমার বাড়ীতে থাকছে। পাড়ার লোকেরা যাচ্ছেতাই বলছে। সুস্থ হয়ে উঠা আশাদীপ্ত অমিতবসু বলল দেবলীনা আমরাতো ছেলে মেয়ে নিয়ে নতুন সংসার করতে পারি। তোমাকে পাওয়ার ভাগ্য কি আমার হবে ? ভগবান কি সেই সুখ কপালে লিখেছে ? রাণু যদি অলককে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করে আমি সহজে ওকে ডিভোর্স করে তোমাকে বিয়ে করতে পারব।
একটু ভেবে উজ্জল মুখে দেবলীনা বলল আমি অলককে ভুলিয়ে বুঝিয়ে রাণুর সাথে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করানোর চেষ্টা করব। তুমি ছেলে নিয়ে কিছুদিন অন্য জায়গায় থাকো।সর্বনাশী রাণুকে একলা ঘরে থাকতে দাও। অমিতদা তোমার ফোন নাম্বার আমায় দাও। আমি সফল হলে তোমায় জানাব। তাতে লাভ হবে না। রাণু সহজে বিয়ের টোপ গিলবে বলে মনে হয় না। ও জানে তাহলে আগের স্বামীর উপর কোন অধিকার থাকবে না। আমি এখনই থানায় গিয়ে রাণুর বিরুদ্ধে নির্যাতনের মামলা করব।তুমি থানায় বধু নির্যাতনের অভিযোগ করবে। প্রতিবেশীরা সাক্ষী আছে।
আমরা ডিভোর্স করতে পারব। আজ থেকে তোমার দায়িত্ব আমি নিলাম। আর একদিনও স্কাউন্ড্রেলটার ঘরে থাকতে হবে না। দেবলীনা তুমি আমায় বিশ্বাস করছতো ? বেডে ছেলেকে পাশে নিয়ে দুই পা ঝুলিয়ে বসে থাকা অমিত বসুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেবলীনা বলল তোমার মতো ভাল মানুষকে অবিশ্বাস করার শক্তি আমার নেই। আমার আশ্রয় ভরসা এখন তুমি। তুমি থানা থেকে ফিরে পালপাড়ার বাড়ীতে গিয়ে মেয়েকে নিয়ে দুর্গাপুর গ্রামে বাবার বাড়ীতে চলে যাবে। অলক ও রাণুর শাস্তি হবে।
তুমি ফোনে আমার সাথে যোগাযোগ রাখবে। আমি নষ্ট চরিত্রের মহিলাকে বাড়ী থেকে সরিয়ে দেব। অনেক আশা নিয়ে অমিত বসু দেবলীনাকে ফোন নাম্বার কাগজে লিখে দিলেন। হাসপাতাল থেকে রিলিজ পাওয়ার পর তিনি পুত্র সহ দেবলীনাকে সাথে নিয়ে কৃষ্ঞনগর সদর থানায় হাজির হলেন। দেবলীনা পুলিশ অফিসারকে তার চরিত্রহীন মাতাল স্বামীর অত্যাচারের কথা বলে অভিযোগ দায়ের করল। জানাল স্বামী মারধর করার জন্য ও মেয়েকে নিয়ে বাবা মায়ের কাছে চলে যাচ্ছে। শিক্ষক অমিত বসু সাক্ষী দিলেন। ও সি বললেন আজই আমি অলক সেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি।
অমিতবাবু অভিযোগ করলেন তার স্ত্রী রাণু এক গামলা গরম জল শরীরে ঢেলে মারার চেষ্টা করেছে। স্ত্রীর পরপুরুষের সাথে অবৈধ সম্পর্ক আছে। ও আমার বাড়ীর দখল নিতে চাইছে। আমার ছেলে ও আমার সহশিক্ষক ছাত্ররা সাক্ষী আছে। অমিতবাবুর পিঠের অর্ধেক শুকনো পোড়া ঘায়ের বড় ক্ষত দেখে ও.সি. গভীর সহানুভূতিতে বললেন মাস্টারমশাই আপনার মতো সৎ আদর্শ লোকের ভাগ্যে এমন বদমাইশ স্ত্রী জুটেছে এটাই দুঃখের। আমি আপনার পালপাড়ার বাড়ীতে গিয়ে আজই ঐ মহিলাকে গ্রেপ্তার করব।
অমিতবাবু নিজের মোবাইল ফোন নাম্বার ও সিকে দিয়ে বললেন স্ত্রীর জন্য আমি ঘরে ঢুকতে পারছি না। আজ আমি ছেলেকে নিয়ে কলকাতা যাব। আপনি কি ব্যবস্থা নিলেন ফোনে জানালে আমি ফিরে আসব।অমিতবাবু থানা থেকে বিদায় নিয়ে সুকান্ত সরণীতে পরিচিত বন্ধু অ্যাডভোকেট দিব্যেন্দু সেনগুপ্তের চেম্বারে এলেন। তিনি জানালেন স্ত্রীর অত্যাচারের শিকার হয়ে ডিভোর্স করতে চান। দেবলীনাকে দেখিয়ে বললেন প্রতিবেশী মহিলা স্বামীর নির্যাতনে অতিষ্ট হয়ে ডিভোর্স করতে চায়। ওদের স্ত্রী ও স্বামীর মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক আছে জেনে দিব্যেন্দুবাবু তাজ্জব হলেন।
আরো বিস্মিত হলেন যখন শুনলেন তার বন্ধু অমিত দেবলীনাকে বিয়ে করতে চায়। দিব্যেন্দুবাবু বললেন, "অমিত তোমাদের কেসটা বড় ইন্টারেস্টিং। আমি তোমাদের ডিভোর্সের মামলা ফাইল আপ করব। কোর্টে ওদের অবৈধ সম্পর্কের প্রমাণের জন্য প্রতিবেশীদের নিয়ে আসবে। স্ত্রীর অত্যাচারের প্রমাণ তোমার পিঠের দগদগে ঘায়ের দাগ। তোমার বউটি দর্জাল জানতাম। এখন দেখছি খুনে প্রকৃতির। আশা করছি তাড়াতাড়ি ডিভোর্স হয়ে যাবে।" দিব্যেন্দু তোমার কাছে আশা নিয়ে এসেছি। এই নিরীহ শিক্ষিত মেয়েটির ও আমার শান্তি এর উপর নির্ভর করছে। দিব্যেন্দুবাবু রসিকতা করে বললেন যেদিন নতুন বউকে নিয়ে গৃহপ্রবেশ করবে আমাকে মিষ্টি খাওয়াবে।
ডিভোর্সের কেস হাতে নিলে মনে হয় সংসার ভেঙে দিচ্ছি। এখানে আনন্দ হচ্ছে দুটো বিষময় সংসার ভেঙে সুখের সংসার গড়তে পারব। মামলা দাখিল করে উকীল বন্ধুর চেম্বার থেকে বেরিয়ে অমিত ছেলের হাত ধরে দেবলীনাকে নিয়ে শাখারী দোকানগুলির পাশ দিয়ে রিক্সা স্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছিল। দুজনকে বেশ আত্মবিশ্বাসী লাগছে। অমিত দেবলীনার হাতে হাজার খানেক টাকা দিয়ে বললেন বাড়ীতে তোমার বাবা মাকে বলবে আমি কলকাতা থেকে ফিরে দেখা করতে ওনাদের কাছে যাবো। দেবলীনা একটি দোকানের সামনে অমিত বসুকে দাঁড় করিয়ে বলল আমি শাখা পলা কিনব। ও পছন্দ করে দু জোড়া শাখা পলা কিনল।
নিজের হাতের শাখা পলা খুলল। ও অমিত বসুকে বলল আমার হাতে শাখা পলা পরিয়ে দাও। অমিতবাবু শাখা পলা পরিয়ে দিতেই প্রণাম করে দেবলীনা বলল আজ তোমার আমার নতুন জীবন শুরু হল। অমিত বসু দেবলীনার চোখে দৃষ্টি রেখে নিজেকে আবিষ্কার করলেন। রিক্সায় চেপে অমিতবাবু ছেলেকে নিয়ে কৃষ্ঞনগর স্টেশনে এসে নামলেন। দেবলীনা ঐ রিক্সায় পালপাড়ার বাড়ীতে গেল। প্রায় একটা বাজে। অলক দোকান থেকে এসে স্নান করতে বাথরুমে ঢুকেছে। বছর ছয়ের মেয়েটি একা ঘরে বসে পুতুল খেলছে।
অলকের সাথে দেখা হলে কোথায় গিয়েছিল কৈফিয়ৎ দিতে হবে। আবার খেতে চাইবে। দেবলীনা এক কাপড়ে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। দুর থেকে দেখল রাণু বাড়ীর ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ওকে লক্ষ্য করছে। কাছে গেলে প্রশ্ন করবে বাবাকে দেখে হাসপাতাল থেকে ছেলে ফিরে এল না কেন ? দেবলীনা তাকে এড়িয়ে পালপাড়া বাস স্ট্যান্ডে চলে এল। শান্তিপুরগামী বাসে চেপে কুড়ি মিনিটের মধ্যে দুর্গাপুর গ্রামে বাপের বাড়ীতে পৌঁছে গেল। অমিত বসু ছেলেকে নিয়ে ট্রেনে উঠে কলকাতার দাদার বাড়ীর উদ্দেশে রওনা হল। রাতে কৃষ্ঞনগর থানার পুলিশ অফিসার ফোনে অমিতবসুকে জানালেন রাণুকে গ্রেপ্তার করে লকআপে রেখেছেন।
কালকে কোর্টে তুলবেন। কেউ না থাকায় ঘরে তালা দিয়ে এসেছেন। বধু নির্যাতনকারী অলক সেনকে বাড়ীতে পাওয়া যায়নি। ওর খোঁজে তল্লাসী চলছে। পরের দিন সকালে অমিতবসু ছেলেকে কলকাতায় মায়ের কাছে রেখে ট্রেনে উঠে কৃষ্ঞনগরে ফিরে আসছেন। দশটার সময় ট্রেন রাণাঘাটে আসতেই দেবলীনার বাবা ওকে ফোনে বলল, "আজ সকালে অলক দেবলীনার দেহে অ্যাসিড ছুড়েছে। ওকে কৃষ্ঞনগর হাসপাতালে ভর্তি করেছি। অমিত তুমি পারলে হাসপাতালে চলে এসো।" উৎকন্ঠায় অমিত বসু বলল মেসোমশাই দেবলীনা কেমন আছে ? অলক কোথায় অ্যাসিড ছুড়েছে।
দেবলীনার বাবা বলল এখন দেবলীনা অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। সকাল ন'টার সময় দুর্গাপুরের বাড়ীতে মেয়ের সাথে পুবের জানালার ধারে রোদে বসেছিল। অলক জানালার বাইরে থেকে ওর মুখ লক্ষ্য করে অ্যাসিড ছুড়েছিল। ও মুখ সরিয়ে নেওয়াতে অ্যাসিড ওর কাঁধে ও বাম হাতে লেগেছে। ওর গায়ে সোয়েটার ছিল। তাই আঘাত গুরুতর হয়নি।পালিয়ে যাওয়া অলককে ধরে গ্রামের ছেলেরা পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। মেসোমশাই আমি এক ঘন্টার মধ্যে কৃষ্ঞনগর হাসপাতালে পৌঁছে যাব। অমিত বসু উদ্বেগ নিয়ে কৃষ্ঞনগর হাসপাতালের ফিমেল সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে এসে গেল।
দেবলীনা বুক পর্যন্ত সাদা চাদরে ঢেকে চোখ বুজে শুয়ে আছে। স্যালাইন চলছে। ওর বাবা মাথার কাছে বসে আছে। অমিতবাবু দেবলীনার কপালে হাত দিয়ে মুখের এলো চুল সরিয়ে দিল। কষ্ট হচ্ছে তোমার ? স্পর্শে দেবলীনা চোখ খুলে বলল তুমি এসে গেছ। এবার কষ্ট কমে যাবে। জানোয়ারটা আমায় মারতে চেয়েছিল। ঠাকুর বাঁচিয়ে দিয়েছে। অমিত বললেন দেবলীনা আমার ভুলে তোমাকে যন্ত্রণা পেতে হচ্ছে। থানায় অভিযোগ জানানোর পর রাসকেল অলকটা যে তোমাকে আক্রমণ করতে পারে এটা ভাবা উচিত ছিল। তোমাকে কলকাতায় মায়ের কাছে নিয়ে গেলে ভাল হত। দেবলীনা ভাঙা গলায় বলল তুমি কোন ভুল করোনি।
এতদিন লোকটার অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করে আমি ভুল করেছি। দেবলীনার বাবা প্রেসকিপশন অমিতের হাতে দিয়ে বললেন বাবা অমিত এই ওষুধ ইনজেকশন ডাক্তার কিনে দিতে বলেছে।আমি এত টাকা আনিনি। মেসোমশাই আমি ওষুধ কিনে আনছি। আপনি বসুন। বলে অমিত হাসপাতালের বাইরে গেলেন। কুড়িদিন পর ছাড়া পাওয়া সুস্থ দেবলীনাকে নিয়ে অমিত বসু ভাড়া গাড়ীতে করে দুর্গাপুর গ্রামের ভাবী শ্বশুর বাড়ীতে এলেন। দেবলীনার কাঁধের ও হাতের কিছু অংশের চামরা অ্যাসিডের দহনে কুচকে গেছে। অমিত ওর বাবাকে প্রণাম করলে তিনি বললেন আমার মেয়েকে অমানুষটার হাত থেকে মুক্ত করে বিয়ে করছো বলে আমরা কৃতজ্ঞ।
অমিত বললেন আমি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ।দেবলীনা আমাকে প্রথম বুঝিয়েছে আমি স্ত্রীর ভালবাসা পেতে পারি। দেবলীনার মা বললেন আমার মেয়ের ভাগ্য ভাল তোমার মতো স্কুল মাস্টার স্বামী পাচ্ছে। অমিত বললেন মাসীমা আমার ভাগ্য ভাল দেবীর মতো স্ত্রী পাচ্ছি। দেবলীনা একপ্লেট মিষ্টি অমিতের হাতে দিয়ে হেসে বলল দেবী কেন ? আমি হলাম দেবলীনা। রাণুর উকীল ভাই চেষ্টা করেও তার জামিন মঞ্জুর করতে পারেনি। বিচারাধীন আসামী অলকের যাবজ্জীবন জেল হতে পারে। আজ ওদের ডিভোর্সের মামলার শুনানী। অমিত কলকাতা থেকে মা ও ছেলেকে নিয়ে এসেছেন।
অমিত ও দেবলীনা ছেলে মেয়েকে নিয়ে সকাল সাড়ে দশটায় কৃষ্ঞনগর জাজ কোর্টে হাজির হয়েছে। রাণুর হয়ে উকীল ভাই ডিভোর্সের বিরোধিতা করছে। বিবাহ বিচ্ছেদের মামলার রায় জানতে পুলিশ প্রহরায় রাণু বসে আছে। সে অগ্নি দৃষ্টিতে দেবলীনাকে দেখছে। তার ধারণা ওর জন্য স্বামী এত মনের জোর পেয়েছে। সরকারী কর্মী দীপক রায় ও পাড়ার দুজন বিশিষ্ট প্রৌড় ব্যক্তি অমিতবাবুর স্ত্রীর সাথে অলকের অবৈধ সম্পর্ক স্বেচ্ছাচারের সাক্ষ্য দিতে এসেছেন। দু পক্ষের উকীলের সওয়াল শুনে বিচারক অমিত বসুর আবেদন মেনে নিলেন। স্বামী ডিভোর্স পেয়ে যাওয়ায় রাণু হতাশ হয়ে পড়েছে।
নিজের ও প্রেমিক অলকের হাজতবাসে বিধস্ত রাণু ছেলের অধিকার দাবী করল।কিন্তু ছেলে বিচারককে জানাল বাবার কাছে থাকবে। ছেলের অধিকার অমিতবসু পেল। পরের মামলায় দেবলীনা সহজে বিবাহ বিচ্ছেদ পেয়ে গেল। অলক বিরুদ্ধাচারণ করেনি। বিকালে উকীল দিব্যেন্দুর অফিসে গিয়ে অমিত ও দেবলীনা রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করল। সই হয়ে যাওয়ার পর দিব্যেন্দু বললেন, "অমিত তোমাদের রাজযোটক মিল হয়েছে। বিয়ের ভোজ কবে খাওয়াবে ?" অমিত বলল আগামী রবিবার রাতে বন্ধুদের জন্য প্রীতিভোজের ব্যবস্থা করব।
তোমায় নিমন্ত্রণ করলাম। বিয়ে করে ছেলে মেয়ের হাত ধরে ওরা গৃহপ্রবেশ করল। অমিতের মা লাল বেনারসী পরা দেবলীনাকে বরণ করে ঘরে তুলে বললেন, "অমিত তোর লক্ষ্মী প্রতিমার মতো বউ হয়েছ। আমাদের ভুল পছন্দে তোর কপালে একটা রাক্ষসী জুটেছিল। ভাগ্যই তোকে সুলক্ষণা বউ এনে দিয়েছে।" যীশুকে পেয়ে দেবলীনার ছেলের সাধ পুর্ণ হল। অমিতের মেয়ের সাধ পুর্ণ হল। ওদের সংসার সুখের আস্বাদ পেল।
অমিতবাবু অভিযোগ করলেন তার স্ত্রী রাণু এক গামলা গরম জল শরীরে ঢেলে মারার চেষ্টা করেছে। স্ত্রীর পরপুরুষের সাথে অবৈধ সম্পর্ক আছে। ও আমার বাড়ীর দখল নিতে চাইছে। আমার ছেলে ও আমার সহশিক্ষক ছাত্ররা সাক্ষী আছে। অমিতবাবুর পিঠের অর্ধেক শুকনো পোড়া ঘায়ের বড় ক্ষত দেখে ও.সি. গভীর সহানুভূতিতে বললেন মাস্টারমশাই আপনার মতো সৎ আদর্শ লোকের ভাগ্যে এমন বদমাইশ স্ত্রী জুটেছে এটাই দুঃখের। আমি আপনার পালপাড়ার বাড়ীতে গিয়ে আজই ঐ মহিলাকে গ্রেপ্তার করব।
অমিতবাবু নিজের মোবাইল ফোন নাম্বার ও সিকে দিয়ে বললেন স্ত্রীর জন্য আমি ঘরে ঢুকতে পারছি না। আজ আমি ছেলেকে নিয়ে কলকাতা যাব। আপনি কি ব্যবস্থা নিলেন ফোনে জানালে আমি ফিরে আসব।অমিতবাবু থানা থেকে বিদায় নিয়ে সুকান্ত সরণীতে পরিচিত বন্ধু অ্যাডভোকেট দিব্যেন্দু সেনগুপ্তের চেম্বারে এলেন। তিনি জানালেন স্ত্রীর অত্যাচারের শিকার হয়ে ডিভোর্স করতে চান। দেবলীনাকে দেখিয়ে বললেন প্রতিবেশী মহিলা স্বামীর নির্যাতনে অতিষ্ট হয়ে ডিভোর্স করতে চায়। ওদের স্ত্রী ও স্বামীর মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক আছে জেনে দিব্যেন্দুবাবু তাজ্জব হলেন।
আরো বিস্মিত হলেন যখন শুনলেন তার বন্ধু অমিত দেবলীনাকে বিয়ে করতে চায়। দিব্যেন্দুবাবু বললেন, "অমিত তোমাদের কেসটা বড় ইন্টারেস্টিং। আমি তোমাদের ডিভোর্সের মামলা ফাইল আপ করব। কোর্টে ওদের অবৈধ সম্পর্কের প্রমাণের জন্য প্রতিবেশীদের নিয়ে আসবে। স্ত্রীর অত্যাচারের প্রমাণ তোমার পিঠের দগদগে ঘায়ের দাগ। তোমার বউটি দর্জাল জানতাম। এখন দেখছি খুনে প্রকৃতির। আশা করছি তাড়াতাড়ি ডিভোর্স হয়ে যাবে।" দিব্যেন্দু তোমার কাছে আশা নিয়ে এসেছি। এই নিরীহ শিক্ষিত মেয়েটির ও আমার শান্তি এর উপর নির্ভর করছে। দিব্যেন্দুবাবু রসিকতা করে বললেন যেদিন নতুন বউকে নিয়ে গৃহপ্রবেশ করবে আমাকে মিষ্টি খাওয়াবে।
ডিভোর্সের কেস হাতে নিলে মনে হয় সংসার ভেঙে দিচ্ছি। এখানে আনন্দ হচ্ছে দুটো বিষময় সংসার ভেঙে সুখের সংসার গড়তে পারব। মামলা দাখিল করে উকীল বন্ধুর চেম্বার থেকে বেরিয়ে অমিত ছেলের হাত ধরে দেবলীনাকে নিয়ে শাখারী দোকানগুলির পাশ দিয়ে রিক্সা স্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছিল। দুজনকে বেশ আত্মবিশ্বাসী লাগছে। অমিত দেবলীনার হাতে হাজার খানেক টাকা দিয়ে বললেন বাড়ীতে তোমার বাবা মাকে বলবে আমি কলকাতা থেকে ফিরে দেখা করতে ওনাদের কাছে যাবো। দেবলীনা একটি দোকানের সামনে অমিত বসুকে দাঁড় করিয়ে বলল আমি শাখা পলা কিনব। ও পছন্দ করে দু জোড়া শাখা পলা কিনল।
নিজের হাতের শাখা পলা খুলল। ও অমিত বসুকে বলল আমার হাতে শাখা পলা পরিয়ে দাও। অমিতবাবু শাখা পলা পরিয়ে দিতেই প্রণাম করে দেবলীনা বলল আজ তোমার আমার নতুন জীবন শুরু হল। অমিত বসু দেবলীনার চোখে দৃষ্টি রেখে নিজেকে আবিষ্কার করলেন। রিক্সায় চেপে অমিতবাবু ছেলেকে নিয়ে কৃষ্ঞনগর স্টেশনে এসে নামলেন। দেবলীনা ঐ রিক্সায় পালপাড়ার বাড়ীতে গেল। প্রায় একটা বাজে। অলক দোকান থেকে এসে স্নান করতে বাথরুমে ঢুকেছে। বছর ছয়ের মেয়েটি একা ঘরে বসে পুতুল খেলছে।
অলকের সাথে দেখা হলে কোথায় গিয়েছিল কৈফিয়ৎ দিতে হবে। আবার খেতে চাইবে। দেবলীনা এক কাপড়ে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। দুর থেকে দেখল রাণু বাড়ীর ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ওকে লক্ষ্য করছে। কাছে গেলে প্রশ্ন করবে বাবাকে দেখে হাসপাতাল থেকে ছেলে ফিরে এল না কেন ? দেবলীনা তাকে এড়িয়ে পালপাড়া বাস স্ট্যান্ডে চলে এল। শান্তিপুরগামী বাসে চেপে কুড়ি মিনিটের মধ্যে দুর্গাপুর গ্রামে বাপের বাড়ীতে পৌঁছে গেল। অমিত বসু ছেলেকে নিয়ে ট্রেনে উঠে কলকাতার দাদার বাড়ীর উদ্দেশে রওনা হল। রাতে কৃষ্ঞনগর থানার পুলিশ অফিসার ফোনে অমিতবসুকে জানালেন রাণুকে গ্রেপ্তার করে লকআপে রেখেছেন।
কালকে কোর্টে তুলবেন। কেউ না থাকায় ঘরে তালা দিয়ে এসেছেন। বধু নির্যাতনকারী অলক সেনকে বাড়ীতে পাওয়া যায়নি। ওর খোঁজে তল্লাসী চলছে। পরের দিন সকালে অমিতবসু ছেলেকে কলকাতায় মায়ের কাছে রেখে ট্রেনে উঠে কৃষ্ঞনগরে ফিরে আসছেন। দশটার সময় ট্রেন রাণাঘাটে আসতেই দেবলীনার বাবা ওকে ফোনে বলল, "আজ সকালে অলক দেবলীনার দেহে অ্যাসিড ছুড়েছে। ওকে কৃষ্ঞনগর হাসপাতালে ভর্তি করেছি। অমিত তুমি পারলে হাসপাতালে চলে এসো।" উৎকন্ঠায় অমিত বসু বলল মেসোমশাই দেবলীনা কেমন আছে ? অলক কোথায় অ্যাসিড ছুড়েছে।
দেবলীনার বাবা বলল এখন দেবলীনা অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। সকাল ন'টার সময় দুর্গাপুরের বাড়ীতে মেয়ের সাথে পুবের জানালার ধারে রোদে বসেছিল। অলক জানালার বাইরে থেকে ওর মুখ লক্ষ্য করে অ্যাসিড ছুড়েছিল। ও মুখ সরিয়ে নেওয়াতে অ্যাসিড ওর কাঁধে ও বাম হাতে লেগেছে। ওর গায়ে সোয়েটার ছিল। তাই আঘাত গুরুতর হয়নি।পালিয়ে যাওয়া অলককে ধরে গ্রামের ছেলেরা পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। মেসোমশাই আমি এক ঘন্টার মধ্যে কৃষ্ঞনগর হাসপাতালে পৌঁছে যাব। অমিত বসু উদ্বেগ নিয়ে কৃষ্ঞনগর হাসপাতালের ফিমেল সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে এসে গেল।
দেবলীনা বুক পর্যন্ত সাদা চাদরে ঢেকে চোখ বুজে শুয়ে আছে। স্যালাইন চলছে। ওর বাবা মাথার কাছে বসে আছে। অমিতবাবু দেবলীনার কপালে হাত দিয়ে মুখের এলো চুল সরিয়ে দিল। কষ্ট হচ্ছে তোমার ? স্পর্শে দেবলীনা চোখ খুলে বলল তুমি এসে গেছ। এবার কষ্ট কমে যাবে। জানোয়ারটা আমায় মারতে চেয়েছিল। ঠাকুর বাঁচিয়ে দিয়েছে। অমিত বললেন দেবলীনা আমার ভুলে তোমাকে যন্ত্রণা পেতে হচ্ছে। থানায় অভিযোগ জানানোর পর রাসকেল অলকটা যে তোমাকে আক্রমণ করতে পারে এটা ভাবা উচিত ছিল। তোমাকে কলকাতায় মায়ের কাছে নিয়ে গেলে ভাল হত। দেবলীনা ভাঙা গলায় বলল তুমি কোন ভুল করোনি।
এতদিন লোকটার অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করে আমি ভুল করেছি। দেবলীনার বাবা প্রেসকিপশন অমিতের হাতে দিয়ে বললেন বাবা অমিত এই ওষুধ ইনজেকশন ডাক্তার কিনে দিতে বলেছে।আমি এত টাকা আনিনি। মেসোমশাই আমি ওষুধ কিনে আনছি। আপনি বসুন। বলে অমিত হাসপাতালের বাইরে গেলেন। কুড়িদিন পর ছাড়া পাওয়া সুস্থ দেবলীনাকে নিয়ে অমিত বসু ভাড়া গাড়ীতে করে দুর্গাপুর গ্রামের ভাবী শ্বশুর বাড়ীতে এলেন। দেবলীনার কাঁধের ও হাতের কিছু অংশের চামরা অ্যাসিডের দহনে কুচকে গেছে। অমিত ওর বাবাকে প্রণাম করলে তিনি বললেন আমার মেয়েকে অমানুষটার হাত থেকে মুক্ত করে বিয়ে করছো বলে আমরা কৃতজ্ঞ।
অমিত বললেন আমি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ।দেবলীনা আমাকে প্রথম বুঝিয়েছে আমি স্ত্রীর ভালবাসা পেতে পারি। দেবলীনার মা বললেন আমার মেয়ের ভাগ্য ভাল তোমার মতো স্কুল মাস্টার স্বামী পাচ্ছে। অমিত বললেন মাসীমা আমার ভাগ্য ভাল দেবীর মতো স্ত্রী পাচ্ছি। দেবলীনা একপ্লেট মিষ্টি অমিতের হাতে দিয়ে হেসে বলল দেবী কেন ? আমি হলাম দেবলীনা। রাণুর উকীল ভাই চেষ্টা করেও তার জামিন মঞ্জুর করতে পারেনি। বিচারাধীন আসামী অলকের যাবজ্জীবন জেল হতে পারে। আজ ওদের ডিভোর্সের মামলার শুনানী। অমিত কলকাতা থেকে মা ও ছেলেকে নিয়ে এসেছেন।
অমিত ও দেবলীনা ছেলে মেয়েকে নিয়ে সকাল সাড়ে দশটায় কৃষ্ঞনগর জাজ কোর্টে হাজির হয়েছে। রাণুর হয়ে উকীল ভাই ডিভোর্সের বিরোধিতা করছে। বিবাহ বিচ্ছেদের মামলার রায় জানতে পুলিশ প্রহরায় রাণু বসে আছে। সে অগ্নি দৃষ্টিতে দেবলীনাকে দেখছে। তার ধারণা ওর জন্য স্বামী এত মনের জোর পেয়েছে। সরকারী কর্মী দীপক রায় ও পাড়ার দুজন বিশিষ্ট প্রৌড় ব্যক্তি অমিতবাবুর স্ত্রীর সাথে অলকের অবৈধ সম্পর্ক স্বেচ্ছাচারের সাক্ষ্য দিতে এসেছেন। দু পক্ষের উকীলের সওয়াল শুনে বিচারক অমিত বসুর আবেদন মেনে নিলেন। স্বামী ডিভোর্স পেয়ে যাওয়ায় রাণু হতাশ হয়ে পড়েছে।
নিজের ও প্রেমিক অলকের হাজতবাসে বিধস্ত রাণু ছেলের অধিকার দাবী করল।কিন্তু ছেলে বিচারককে জানাল বাবার কাছে থাকবে। ছেলের অধিকার অমিতবসু পেল। পরের মামলায় দেবলীনা সহজে বিবাহ বিচ্ছেদ পেয়ে গেল। অলক বিরুদ্ধাচারণ করেনি। বিকালে উকীল দিব্যেন্দুর অফিসে গিয়ে অমিত ও দেবলীনা রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করল। সই হয়ে যাওয়ার পর দিব্যেন্দু বললেন, "অমিত তোমাদের রাজযোটক মিল হয়েছে। বিয়ের ভোজ কবে খাওয়াবে ?" অমিত বলল আগামী রবিবার রাতে বন্ধুদের জন্য প্রীতিভোজের ব্যবস্থা করব।
তোমায় নিমন্ত্রণ করলাম। বিয়ে করে ছেলে মেয়ের হাত ধরে ওরা গৃহপ্রবেশ করল। অমিতের মা লাল বেনারসী পরা দেবলীনাকে বরণ করে ঘরে তুলে বললেন, "অমিত তোর লক্ষ্মী প্রতিমার মতো বউ হয়েছ। আমাদের ভুল পছন্দে তোর কপালে একটা রাক্ষসী জুটেছিল। ভাগ্যই তোকে সুলক্ষণা বউ এনে দিয়েছে।" যীশুকে পেয়ে দেবলীনার ছেলের সাধ পুর্ণ হল। অমিতের মেয়ের সাধ পুর্ণ হল। ওদের সংসার সুখের আস্বাদ পেল।
........সমাপ্ত
"রাজযোটক" গল্পটির দ্বিতীয় অংশ পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা কিন্তু আমাকে জানাতে ভুলবেন না। আপনি আরো গল্প পড়তে আমাকে অনুসরণ করতে পারেন। গল্পটি পড়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মেহেদী হাসান পিয়াস
©



No comments