অ্যাডভেঞ্চার

অ্যাডভেঞ্চার - Green Vivacity
অ্যাডভেঞ্চার - Green Vivacity


                     আমার তখন সবে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়ে ছিল। মাসটা ওই এপ্ৰিলের শেষের দিক। খুব সম্ভবতঃ বৈশাখ মাস। এর পর প্রায় তিন মাস ছুটি। এর কিছু দিন পরেই ছিল ভানু-মামার বিয়ে। ভানু-মামা আমাদের নিকট আত্মীয় হলেও মায়ের সহোদর ভাই নয়।

বাড়িতে কি একটা কাজ পড়েছিল। কেউ গেল না, শেষে আমাকে একাই যেতে হল। আমারও মন্দ লাগছিল না। ছুটিটা ঘরে বসে কাটানোর কোন মানে হয় না। সেই মতে বেরিয়ে পড়লাম। আসলে ঘুরতে আমার বড় ভালো লাগে। গল্প-উপন্যাস পড়ে পড়ে কেমন একটা অ্যাডভেঞ্চারের নেশা পেয়ে বসেছে। কিন্তু আশা পূরণ এখনও অব্দি হয় নি !

যাই হোক, ট্রেন থেকে নেমে ভাগ্যক্রমে একটা রিক্সা পেয়ে যাওয়ায় এক চরম দূর্ভোগ থেকে বেঁচে গেলাম। ব্যাগটা পায়ের কাছে রেখে আমি বেশ আরাম করে বসলাম। পাক্কা দেড় ঘন্টা পর পৌঁছলাম শিমূলপুরে। কিন্তু আমার দূর্ভাগ্য পথে একটাও শিমূল গাছ দেখতে পেলাম না ! তবে গ্রাম্য পরিবেশ বলতে যা বোঝায় তা এখানে ষোল আনাই বিদ্যমান। সামনে দু-একটা ছোট খাটো পাহাড়ও আছে।

এখানেই পরিচয় হল বীরুদার সাথে। সে আমার দূর সম্পৰ্কের দাদা, পেশায় ড্রাইভার। বীরুদা তার জীপে করেই এসেছিল শিমূলপুরে। এই রকম একটা অজ পাড়া-গাঁয়ে ভাগ্যিস বীরুদাকে কাছে পেয়েছিলাম। তার দীর্ঘ দিনের ড্রাইভারের অভিজ্ঞতার নানা গল্প শুনতে লাগলাম তার কাছ থেকে। তার কাছে শুনেই হঠাৎ ঠিক করে ফেললাম পরের দিন 'প্রিতিভোজ' খেয়ে বিকেল বেলায় বেশ কিছুটা দূরের ঘন জঙ্গল ঘেরা পঞ্চ-পাহাড় দেখতে যাব। যেমন কথা তেমন কাজ। পরদিন খাওয়া-দাওয়া হতেই শুরু হল তোড়জোড়। ভানু মামাকে বললাম "আমি বীরুদার সাথে পঞ্চ-পাহাড় দেখতে যাব, ফিরতে রাত হতে পারে। মামা বাধা দিলেন না। মামা জানেন যে আমি ঘুরতে ভালোবাসি, আর তা যদি হয় পাহাড়, নদী বা বন-জঙ্গল তা হলে তো আর কথাই নেই।

তাছাড়া মামা বীরুদাকে ভালোভাবেই জানেন, যেমন সাহসী ছেলে তেমনি কর্তব্যপরায়ন। তবু তাকে ডেকে কিছু বলেদিলেন আর টিফিনে করে মাংস, রাধাবল্লভী, মিস্টি ইত্যাদি ভরে দিয়ে দিলেন। রাস্তায় দু'জনের খাওয়ার জন্য। আমি আর বীরুদা ঠিক তিনটে সাড়ে তিনটে নাগাদ রওনা হলাম জীপে করে। প্রায় ৪০-৪৫ মিনিট পর একটা জঙ্গল পেলাম, এই জঙ্গলের শেষ প্রান্তে পরপর পাঁচটি পাহাড়। এদেরই একত্রে পঞ্চ-পাহাড় বলে। জঙ্গলটা পার হতে আরও ৪০-৪৫ মিনিট লেগে গেল। মাস খানেক আগে গজানো নতুন পাতায় রোদের ঝিকিমিকি, বিশাল বিশাল পাহাড়, গাছের হিলদোল, পাখির কলরব সত্যিই মনকে এক অন্য জগতে টেনে নিয়ে যায়। এখানের শান্ত, শীতল ও স্নিগ্ধ ছায়া পূর্বের এক ঘন্টার ক্লান্তি সব ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল। মনে হল যেন কোন এক আদিম যুগে ফিরে গেছি, যেখানে কল-কারখানা নেই, চিৎকার-চেঁচামেচি নেই, আছে শুধু পাখির কলতান, পাতার মর্মর শব্দ, নাম না জানা ফুলের সুগন্ধ। সত্যিই কি সুন্দর দৃশ্য ! চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করা যায় না। জঙ্গলটাও বেশ ঘন। মাঝে মাঝেই সূৰ্যদেব ও গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ছেন। এই জঙ্গলটার প্রতি সরকারও দেখলাম যথেষ্ট নজর দিয়েছেন। পাকা রাস্তা তো আছেই বেশ কিছু হরিণ, ময়ুর ইত্যাদি পশু-পাখিও ছাড়া হয়েছে।

যাই হোক, এই স্বর্গীয় সৌন্দৰ্য্যকে পেছনে ফেলে আমরা হাজির হলাম পাহাড়ের ধারে। জীবনে এই আমার প্রথম পাহাড়ে পদার্পন। সামনের পাহাড়টা বেশ উঁচু। প্রথমে আমি চামড়ার জুতো পরেই উপরে উঠছিলাম, পরে অসুবিধা হচ্ছিল বলে একটা বড় পাথরের নীচে খুলে রেখে দিলাম। বীরুদাও রাখল। পাহাড়টাতে বড় গাছ নেই বললেই চলে শুধু বড় বড় পাথরের স্তুপ আর এখানে সেখানে কাঁটা গাছ, ছোট-ছোট লতা-পাতার ঝোঁপ। বীরুদা এর আগে দু-তিন বার পাহাড়ে চড়েছে তাই আমার চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি উঠছিল। আমিও গাঁয়ের ছেলে গাছে চড়া থেকে সাঁতার কাটা সবই জানি ! আমি গিয়ে সব চেয়ে উঁচু বিশাল পাথরটার উপর উঠলাম। যে দিক দিয়ে এসেছি সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম এই পাথরময় পাহাড়টা বাদ দিয়ে বাকী শুধু সবুজ আর সবুজ। কালো পিচের রাস্তাটার চিন্হও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। নীচে দাঁড়ানো জীপ গাড়িটা যেন একটা খেলনা জীপ গাড়ির এত ছোট মনে হচ্ছে ! উল্টো দিকটায় ঘুরে দাঁড়ালাম। এদিকটায় অত গাছ-পালা নেই। একটু দূরের সর্পিলাকার মেঠো রাস্তাগুলো কি অপার্থিব সৌন্দৰ্য্যই না দখল করেছে। বীরুদা বলল "ওই দিকটায় চল"। আমি সঙ্গে সঙ্গে ওই 'সর্ব্বোচ্চ সিংহাসন' থেকে নেমে চলতে শুরু করলাম।

 দু'একটা পাথরের টুকরো নিয়ে নীচে গড়িয়ে দিলাম আর বীরুদাকে বললাম 'দেখ এখান থেকে গড়িয়ে পড়লে কি হবে !' পাথরগুলো গড়িয়ে গড়িয়ে দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। একটু এগিয়ে যেতেই বীরুদার সামনে দিয়ে কি একটা পাখি উড়ে চলে গেল ! যেখানে পাখিটা বসেছিল সেখানে চাইতেই দেখি বাদামী রঙের উপর কালো ফোটা ফোটা দেওয়া দুটো ছোট্ট ছোট্ট ডিম। বাসা করারও প্রয়োজন বোধ করে নি ! দু'-চারটে ছোট ছোট মরা গাছের নীচে কতগুলো শুকনো ঘাস পাতার উপর পড়ে আছে ডিমগুলো। ওদিকটাই শুধু পাথর, এখানে কিছুটা মাটি আছে তাই কিছু বেহায়া গাছ এখানে ওখানে জন্মেছে। আমরা কিছুক্ষণ একটা বড় পাথরের নীচে হেলান দিয়ে বসলাম। আমরা দু'জনে একেবারে অভিভূত। ক্যামেরাটা না নিয়ে আসার জন্য খুব আফশোস হচ্ছিল। একটু জিরিয়ে আবার অন্য দিকটায় যেতে শুরু করলাম। একেবারে যেদিকটা দিয়ে উঠলাম তার ঠিক উল্টো দিকে। ওদিকটায় গিয়ে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল ! চারিদিকে যেন সৌন্দৰ্য্য প্রতিযোগিতা হচ্ছে। এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায় দেখ ! দেখলাম পাহাড়টার নীচে একটা ছোট্ট গ্রাম। বেশির ভাগ ঘরই খড়ের ছাউনি দেওয়া। এই সুউচ্চ পাহাড় থেকে ওই ছোট্ট গ্রামটাও অপূর্ব সুন্দর দেখাচ্ছে।

বীরুদা এর আগে এখানে এক-দুবার এসেছিল তার মুখেই শুনলাম গ্রামটার নাম পাঁচ-পাহাড়ী না কি ! ঠিক তার মনে নেই। সে নাম যাই হোক। পাশের উঁচু পাথরটার উপর চেপে আমরা দু'জনে বসলাম। সত্যিই অপার্থিব। এমন সুন্দর গ্রাম থাকতে কি আর শহরে থাকতে ইচ্ছে হয় ! যারা শহরের মায়াজালে পড়ে এমন সৌন্দৰ্য্য থেকে বঞ্চিত শত ধিক তাদের ভাগ্যে। দেখলাম কয়েকজন রাখাল গোরু নিয়ে গ্রামের ভেতর প্রবেশ করল। পুকুর পাড়ের রাস্তার ধুলো উড়িয়ে তারা একে একে চলেছে নিজের নিজের ঘরের দিকে। গ্রামের মাঝে একটা জীর্ণ মন্দির আর পাশে খুব সম্ভবত একটা স্কুল । ঘরগুলোও বেশ সুন্দর লাগছিল তবে খড়ের ঘরগুলো বেশি ভালো লাগছিল। আমরা বেশ কিছুক্ষণ ওখানে বসেই কাটালাম।

ঘড়িতে দেখলাম ৬ টা বাজে। বীরুদা বলল "চল, নীচে ওই পুকুরটাতে হাত মুখ ধুয়ে ভানু মামার দেওয়া খাবারগুলো উদ্ধার করি গে।" আমি বললাম "চল, কিন্তু এখান থেকে নড়তেই যে ইচ্ছে করছে না।" তখন হালকা অন্ধকার নেমে এসেছে, আকাশের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। আজ দিনে যা ভ্যাপসা গরম ছিল দু-এক পশলা বৃষ্টি হলেও হতে পারে। তাছাড়া আর কয়েকদিন পরেই অমাবস্যা সন্ধ্যের পরই ঝপ করে অন্ধকার নেমে আসবে। তাই অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও নামতে শুরু করলাম। যেখানে জুতোগুলো রেখেছিলাম সেখান থেকে হাতে তুলে নিলাম। নামাও যথেষ্ট বিপজ্জনক একবার পিছলে পড়ে গেলে আর আস্ত ফিরতে হবে না ! ওই পাথরগুলোর মত অবস্থা হবে । তাই নামতে বেশি সময় লাগতে লাগল। বীরুদা আগে আগে নামছিল আর আমি পেছনে। হঠাৎ আমার মনে হল কে যেন আমার ঠিক পেছন পেছন আসছে ! বীরুদাকে বললাম সে কথা। বীরুদা আমাকে আগে আগে যেতে বলল। আমি যে খুব ভীতু প্রকৃতির তা নয়। তবে নানা রকম ভৌতিক গল্প পড়ে বা শুনে এমন হয়ে গেছে যে মাঝে মধ্যে সময় সুযোগ বুঝে ওই সব দৃশ্য আমার চোখের সামনে চলে আসে আর বুকে হাঁতুড়ি পেটানো শুরু হয়ে যায়। যাই হোক, ভালোভাবেই নীচে নেমে এলাম। জুতোগুলো পরে ফিতে বেঁধে নিলাম। বীরুদা গাড়ী থেকে একটা বড় খালি জলের বোতল বার করল, জল আনার জন্য। খাবার জল গাড়ীতেই ছিল। দু-চার ঢোক জল খেয়ে রওনা হলাম সামনের পুকুরটার দিকে।

পুকুরটা বেশ বড় তবে সংস্কারের অভাবে অনেকটাই মজে গেছে। আর চারপাশ ঘাস-আগাছায় ভরে আছে। আমি একটা পাথরে বসে হাত-মুখ ধুলাম, বীরুদাও হাত-মুখ ধুয়ে বোতলটাতে করে এক বোতল জল নিয়ে নিল। জলটা বেশ পরিস্কার আর ঠান্ডা।

এর মধ্যে কোথা থেকে কালো মেঘ এসে সারা আকাশ ঘিরে ফেলেছে আমরা এতক্ষণ তা লক্ষ্যই করি নি ! দ্রুত পা চালাতে শুরু কোরলাম। কিন্তু গাড়ীর কাছে পৌছাবার আগেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। চোখের সামনে ঘড়িটা নিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম, মনে হল ৭টা বাজে। ঘড়িটা 'ওয়াটার প্রুফ' তাই পরেই থাকলাম। গাড়ীটার কাছে এসে দেখলাম সমস্ত বন-জঙ্গল এক ভয়াবহ আকৃতি নিয়েছে ! চারিদিক শুধু অন্ধকার। বীরুদা বলল "চল প্রথমে এই জঙ্গল থেকে বার হই তারপর খাওয়া যাবে।" এই সময় রাজী না হয়ে উপায় নেই। খিদে পেয়েছিল ঠিকই কিন্তু এখন খাওয়ার সময় নয়। গাড়ীতে উঠে পড়লাম। কিন্তু এ কি ! গাড়ী যে স্টার্ট নিচ্ছে না। সময় যত গড়াচ্ছে ঝড়-জলও তত বাড়ছে। আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অন্ধকার। আমার চোখের সামনে কাল্পনিক ভূতগুলো উঁকি-ঝুঁকি মারতে শুরু করল ! একদিকে এই ভয়ানক বিশাল জঙ্গল আর আমরা মাত্র দু'জন। এখন মনে হচ্ছে, এতটা দেরি করা আমাদের উচিৎ হয় নি ! বীরুদা গাড়ী থেকে নেমে ওই জলের মধ্যেই গাড়ীটা ঠিক করার চেষ্টা করতে লাগল।

আমি ভেতরেই বসে রইলাম আর সামনের কাঁচ দিয়ে তাকে লক্ষ্য করতে লাগলাম। যদিও দেখতে কিছুই পাচ্ছিলাম না। দু'একবার বিদ্যুতের ঝলকে তার মুখমন্ডল ভেসে উঠছিল তারপর আরও অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছিল ! বীরুদা আমাকে বার-বার সাহস জোগাচ্ছিল। ওই অন্ধকারেই না জানি কোনদিকে কোনদিকে হাত চালাচ্ছিল বীরুদা। একটা টর্চ লাইটও সঙ্গে আনিনি। আমরা ভাবিই নি এরকম অবস্থায় পড়তে হবে। হঠাৎ আমার সন্দেহ হল কেউ যেন আমাদের চারপাশে প্রদক্ষিণ করছে ! এবার আর বীরুদাকে কিছু বললাম না। শুধু ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়টাকে সজাগ রেখে চুপচাপ অন্ধের মত অন্ধকারে বসে থাকলাম !

বৃষ্টি বেড়েই চলেছে। দিনের সেই পাতার মর্মর শব্দ, পাখির কলতান সবই এখন অতীত। জঙ্গলে বৃষ্টি যে এত ভয়ঙ্কর তা আমার জানা ছিল না ! এখন শুধু বৃষ্টির শব্দ আর তার সাথে সাথে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। মাঝে মাঝে হৃৎপিণ্ড টাকে মুচড়ে দিয়ে ভেসে আসছে শেয়ালের ডাক, হায়নার অট্টহাসি, ময়ুরের কেকা (ডাক) এবং আরও কত জানা-অজানা শব্দ ! চারিদিক শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার, কোথায় গাছ আর কোথায় আকাশ কিছুই বোঝা যায় না ! যেন কোন দেবী তার কালো এলোচুলে সবকিছু ঢেকে দিয়েছেন। দিনের সেই মনোরম সৌন্দৰ্য্য যে রাতে এমন ভয়ঙ্কর বিভিষিকা হতে পারে তা যাদের জীবনে দেখবার সৌভাগ্য হয় নি তাদের বোঝানোর মত ক্ষমতা আমার নেই। ভাগ্যিস ! বীরুদা মত একজন সাথে ছিল, নইলে অনেক আগেই আমি জ্ঞান হারাতাম !

তারপর বীরুদা যখন ঠিকঠাক করে গাড়ী স্টার্ট দিল তখন ঘড়িতে ৭:৩৫। আমি বললাম "এবার তাড়াতাড়ি চল বীরুদা, ভয়ে আমার শরীরে কাঁটা দিচ্ছে।" বীরুদা সাহস জুগিয়ে বলল "এই জঙ্গলটা পার হলেই আর কোন অসুবিধে নেই।" আমিও মনে মনে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করতে লাগলাম যাতে জঙ্গলটা তাড়াতাড়ি পার হতে পারি। কিন্তু তখনও কি জানতাম আরও অনেক কিছু অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য ! না জানি ভানু মামা কি ভাবছেন !

বীরুদা আপাদমস্তক ভিজে গেছে। ঠান্ডা হাওয়ায় দুজনেই কাঁপছি। এরকম অবস্থায় কিছুক্ষণ চলার পর হঠাৎ একটা বাঁক ঘুরতেই দেখি রাস্তার মাঝে দুটো ডাল ভেঙে পড়ে আছে ! অগত্যা নীচে নেমে সরানো ছাড়া উপায় নেই। ভয়ে ভয়ে নামলাম ! আশার কথা, এখন গাড়ীর হেড লাইট গুলো জ্বলছে ! তাড়াতাড়ি দুজনে, বলতে গেলে বীরুদা একাই, ডালদুটো সরিয়ে আবার গাড়ীতে উঠলাম। যতটা কম সময় মনে হচ্ছে অত কম সময় কিন্তু নয়। গাড়ীতে উঠে দেখলাম সোয়া আটটা বাজছে। বৃষ্টির রেশ এখন অনেকটাই কমেছে কিন্তু অন্ধকার আরও ঘন হয়েছে। হেড লাইটের আলোয় সামনের রাস্তাটুকু খালি দেখা যাচ্ছে বাকি চারপাশে কালো ঘন অন্ধকার।

এরপর বড় জোর মিনিট পাঁচেক চলেছি। হঠাৎ দেখি একেবারে চাকার সামনে একটা ১৪-১৫ বছর বয়সের মেয়ে ! কোত্থেকে এসে একেবারে চাকার সামনে উদয় হল বুঝতেই পারলাম না ! পাকা ড্রাইভার বীরুদা ঠিক সময়ে ব্রেক না কষলে হয়ত চাকার নীচে চাপাই পড়ে যেত মেয়েটা। বীরুদা ধমক দিয়ে উঠল। মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলল "আমার বাবা কাঠ কাটতে এসেছিল এই জঙ্গলে। বলেছিল সন্ধ্যের আগেই ফিরে আসবো। কিন্তু আসে নি ! তাই আমি এই ঝড়-বৃষ্টিতে বাবাকে খুঁজতে এসে নিজেই পথ হারিয়ে ফেলেছি। যদি দয়া করে জঙ্গলটা আমাকে পার করে দেন তাহলে আমি বাড়ি যেতে পারব।" বীরুদা অসহায় মেয়েটাকে দেখে কেমন যেন গলে গেল। সে তাকে পেছনের সিটে বসতে বলল। আমি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম "কোথায় তার বাড়ি, নাম, বাবার নাম ইত্যাদি।"

এরপর বেশ কিছুক্ষণ চলেছি কিন্তু জঙ্গল যেন আর শেষ হতেই চায় না ! ঘড়িতে দেখলাম প্ৰায় ১০টা। অর্থাৎ আরও দেড় ঘন্টারও বেশি পথ চলা হয়ে গেছে , তবু জঙ্গল শেষ হবার কোনও লক্ষণই নেই !

হঠাৎ, আয়নাতে চোখ পড়তেই শিউরে উঠলাম ! অস্পষ্ট আলোয় দেখলাম মেয়েটা কেমন এক দৃষ্টিতে বীরুদার দিকে তাকিয়ে আছে। আর বীরুদা কোন এক অদৃশ্য শক্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে চলেছে। একবার করে মেয়েটার চোখ দুটো জ্বল জ্বল করে উঠছে ! বাইরে তাকিয়ে দেখলাম ঘন অন্ধকার, বৃষ্টি সেই আগের মত বেশ জোরে জোরেই পড়ছে ! গাড়ীর হেড লাইটের আলোয় রাস্তটুকু ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আমি বীরুদাকে জোরে ধাক্কা দিতেই সে যেন এক অন্য জগৎ থেকে এসে এখানে পড়ল ! বললাম "প্রায় দু'ঘন্টা গাড়ী চালানো হয়ে গেল এখনও জঙ্গলটা শেষ হল কই !" এবার বীরুদা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। হতভম্ভ হয়ে জিজ্ঞেস করল "কটা বাজছে ?" "১০ টা" বললাম আমি। এরপর ৫ মিনিটও হয়নি দেখলাম আমাদের গাড়ীর আগে আগে ছায়ার মত কারা যেন লম্বা লম্বা পা ফেলে ছুটে চলেছে ! এ দৃশ্য বীরুদাও দেখল। তখনও ভাবতে পারিনি যে আমাদের গাড়ীতে যে অসহায় মেয়েটি বসে আছে সে আসলে মেয়ে নয়। হঠাৎ, মেয়েটির দিকে ঘুরে কি বলতে গিয়েই চমকে উঠে দেখি "তার চেহারা সম্পূৰ্ণ পাল্টে গেছে। সারা শরীরের হাড়গুলি বেরিয়ে এসেছে, আর চোখ দুটো আগুনের মত জ্বলছে !" আমি ঘুরে দেখেই হতবম্ভ হয়ে গেলাম। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। এই আমার জীবনে প্রথম ভূত দেখা ! তাও আবার এত সামনে থেকে।

কি করব কিছু ভাবতেই পারছিলাম না। কেবল শুনতে পেলাম "দৌড় দৌড়"। বীরুদা গাড়ী দাঁড় করিয়ে, দরজা খুলে বার হতেই আমিও সম্বিত ফিরে পেয়ে দরজা খুলে বীরুদার সাথে সাথেই দৌড় লাগালাম। মনে হচ্ছে আমাদের পেছন পেছন একটা হাতের মত কি যেন ছুটে আসছে আর দূর থেকে ভেসে আসছে এক অদ্ভুত অট্টহাসি ! সে অট্টহাসি কার আমাদের জানা কিন্তু পেছন ফিরে দেখার সময় এখন নয়। সেই রাতে ওই অন্ধকারে, ওই বৃষ্টিতে দুজনে কোথায়, কোন পথ দিয়ে কতক্ষণ ছুটেছি কিছু মনে নেই !

সকালে যখন বীরুদার ঝাঁকুনিতে জ্ঞান ফিরল "দেখলাম একটা ছোট্ট কুঁড়ে ঘরে পড়ে আছি আমি আর আমার পাশে বসে বীরুদা।" যাক তাহলে বেঁচে আছি। হড়বড়িয়ে উঠলাম তাহলে কি কাল রাতের ঘটনাগুলো সব স্বপ্ন ছিল ! এই ভাবতে না ভাবতেই দেখি আদিবাসীদের একজন ৫০-৬০ বছরের প্রৌঢ় ঘরে প্রবেশ করলেন। তাঁর মুখেই শুনলাম, তিনিই নাকি আরও কয়েক জনের সাথে ভোরের দিকে আমাদের জঙ্গলের পাশে পড়ে থাকতে দেখেন এবং সবাই মিলে আমাদের তুলে এখানে নিয়ে আসেন। বাইরে দেখলাম আরও কয়েক জন দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁরা আমাদের সুস্থ দেখে খুশি হলেন।

বীরুদা, আমি আগা-গোড়া সব কথা তাদের খুলে বললাম। আমাদের কথা শুনে একজন বলে উঠল যে ওই মেয়েটির নাম নাকি চম্পা আর ওর বাবার নাম মঙলু। হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে এইরকমই বলেছিল বটে !

এবার প্রৌঢ় লোকটি বললেন "আজ থেকে ৩-৪ বছর আগের কথা। মঙলু একদিন গিয়েছিল ওই জঙ্গলে কাঠ কাটতে। সে প্রতিদিনই যেত, সেই রকম সেদিনও গিয়েছিল। কিন্তু সন্ধ্যে হতেই শুরু হয় ভয়ানক ঝড়-বৃষ্টি। বাড়িতে একা ছিল তার মেয়ে চম্পা। অনেক রাত পর্যন্ত মঙলু বাড়ি না ফেরায় চম্পা চিন্তিত হয়ে পড়ে। পোড়ামুখির আপন বলতে আর কেউ ছিল না। বৃষ্টি একটু কমলে চম্পা একটা হ্যারিকেন নিয়ে বাপকে খুঁজতে যায়। এদিকে বৃষ্টি থামলে মঙলু বাড়ি ফিরে আসে কিন্তু চম্পা আর ফিরে আসে নি। পরের দিন সকালেও আমরা বিস্তর খোঁজা খুঁজি করি। কিন্তু তার কোনও হদিস পায় নি। পাহাড়ের পাশে তার হ্যারিকেনটা পড়ে থাকতে দেখে আমরা ধরে নিই যে সে আর বেঁচে নেই। মেয়েকে বড় ভালোবাসত মঙলু। মেয়ের এইরকম অকাল মৃত্যুকে সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে নি। মেয়ের শোকে বাপটা নাওয়া-খাওয়া ভুলে পাগলের মত হয়ে যায়।

গত বছর সে মারা গেছে ! বাপের মৃত্যুর পর থেকেই মেয়ের আত্মা নানা রকম উৎপাত শুরু করে। আমরা তাই এখন আর রাতের দিকে জঙ্গলে যাই না। ওদের খপ্পরে পড়েও যে তোমরা বেঁচে ফিরে এসেছো এটাই ভগবানের পরম কৃপা।"

এইসব শুনে আমরা তো থ । রাতে যা কিছু শুনেছি, দেখেছি তা স্বপ্ন নয় এখনকার মতই কঠিন বাস্তব। শিমূলপুরে এসে আমার শুধু পাহাড়-জঙ্গলই নয় ভূত দেখারও বিরল 'সৌভাগ্য' হয়ে থাকল। তবে এই 'সৌভাগ্য' আর দ্বিতীয়বার না হলেই চিরকৃতজ্ঞ থাকব !

আমরা কয়েকজন লোক সাথে নিয়ে আবার জঙ্গলে ঢুকলাম। এখন বেশ রোদ উঠেছে। গাছে গাছে পাখিদের কূজন শোনা যাচ্ছে। চারপাশ আলোয় ভরে উঠেছে। কাল রাতে ওভাবে দৌড়ানোর সময় আমাদের জুতো গুলো কোথায় পড়ে গেছে ! রাস্তায় আর তাদের দেখা পেলাম না। হয়তো ভূত-পেত্নিদের ওগুলো মনে ধরেছিল, তাই সাথে নিয়ে গেছে। আর যাই হোক ভূত সমাজে ওরকম জুতো পাওয়া যায় বলে মনে হয় না। তবে জীপটা খুঁজে পেলাম। দেখলাম সবই ঠিক আছে।

এতক্ষণ 'অ্যাডভেঞ্চারে'র নেশায় বুঝতেই পারি নি কখন পেটে ইঁদুরের দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেছে। মনে একটা ক্ষীণ আশা জাগল যে জীপটা যখন অক্ষত পাওয়া গেছে তখন খাবারগুলো নিশ্চয় আছে ! কিন্তু পরক্ষণেই আশাহত হলাম। জীপে উঠে দেখি ডিকির দরজা হা করে খোলা, ভেতরে কিচ্ছু নেই ! আমি বীরুদাকে জিজ্ঞেস করলাম "চাবিটা !" বীরুদা পকেট থেকে চাবির গোছাটা বার করে সামনে তুলে ধরে বলল "এই তো "।

যে কয়েকজন সাথে গেছিল তারাই ঘরে নিয়ে গিয়ে পেট পুরে খাওয়াল। আমরা প্রায় ন'টার সময় ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওনা দিলাম। রাস্তায় ভাবছিলাম কাল রাতটা ভানু মামাদের উপর দিয়ে কি রকম গেছে ! এখানে বেড়াতে এসে তাঁদের বড় চিন্তায় ফেলে দিয়েছি। এবার তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছাতে পারলে হয়। হঠাৎ, পথে দেখি ভানু মামা, দাদু এঁরা সকলে গাড়ীতে করে এদিকেই আসছেন। মামা আমাদের দেখতে পেয়ে গাড়ী থেকে মুখ বার করে রাগি রাগি গলায় জিজ্ঞেস করলেন "হতচ্ছাড়া, কাল থেকে এখানে তোরা কোথায় ছিলি ? কি করছিলি ?" আমি হাসতে হাসতে বললাম "অ্যাডভেঞ্চার !"

                                                           ........সমাপ্ত

"অ্যাডভেঞ্চার" গল্পটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা কিন্তু আমাকে জানাতে ভুলবেন না। আপনি আরো গল্প পড়তে আমাকে অনুসরণ করতে পারেন। গল্পটি পড়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।


মেহেদী হাসান পিয়াস

                                                                             ©

1 comment:

Powered by Blogger.